শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

নতুন সভ্যতার সন্ধানে

নাজমুল ইসলাম জোবায়ের
পৃথিবীর সূচনালগ্ন থেকেই মানবসভ্যতার গোড়াপত্তন। সৃষ্টির শুরু থেকেই পৃথিবী কোনো না কোনো সভ্যতার কোলে আশ্রয় নিয়েছে। এখানে শত শত সভ্যতার গোড়াপত্তন হয়েছে আবার কালের বিবর্তনে এগুলো হারিয়ে নতুন সভ্যতার অভ্যুদয় ঘটেছে। সভ্যতার উত্থান-পতনের মধ্যদিয়েই এগিয়ে চলছে পৃথিবী।
সভ্যতার মূল উপাদান হলো- অর্থনৈতিক উপায়-উপকরণ ও কর্মপদ্ধতি, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক অবকাঠামো, নৈতিক রীতিনীতি ও বিধিবিধান, জ্ঞানবিজ্ঞান এবং শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। কিন্তু সভ্যতার উন্নয়নে একটি জাতির মধ্যে প্রয়োজন ধর্ম, ভাষা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। একটি সদ্য গড়ে উঠা সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় বিধিবিধান, সর্বজনীন জীবনদর্শন এবং বৃহত্তম ঐক্য, মানবহিতৈষী ধ্যানধারণা, উন্নত নৈতিক আচরণ এবং বাস্তবভিত্তিক জীবনাচার। এ গুণগুলোর সমন্বিত রূপ সাধারণত আমরা সত্য ধর্মের মধ্যেই খুঁজে পাই। কারণ সত্য ধর্ম বস্তুজগৎ ও আধ্যাত্মিকতার মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে থাকে। ফলে সভ্যতা টিকিয়ে রাখার জন্য ধর্ম একটি অপরিহার্য বিষয়।
১৫ শতাব্দীর পরে পাশ্চাত্য সভ্যতার গর্ভে যে সকল সাম্রাজ্যের জন্ম হয়েছে তাদের সভ্যতার ভিত্তি এক ও অভিন্ন। যেমন, ডাচ সাম্রাজ্য (১৫৮৮-১৭৯৫) ব্রিটিশ সাম্রাজ্য (১৮১৫-১৯১৪) সোভিয়েত ইউনিয়ন (১৯১৮-১৯৯১) আমেরিকান সাম্রাজ্য (১৯৪৫ থেকে চলমান) চীন সাম্রাজ্য (উত্থান কাল)। এ সকল মূল সাম্রাজ্যের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি ছোট সাম্রাজ্যেরও জন্ম হয়েছিল।
পাশ্চাত্য সভ্যতার মূল ভিত্তি হচ্ছে বস্তুবাদ ও ধর্মবিমুখতা। মূলত প্রারম্ভিক রেনেসাঁ ও প্রাথমিক আধুনিক যুগের মাধ্যমে ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করার মিশন শুরু হলেও সফল হয় ১৯ শতকে এসে। তবে এ সকল সাম্রাজ্য বরাবর ধর্মকে দূরে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করলেও সাম্রাজ্যের প্রয়োজনে পরিপূর্ণ সক্ষম হয়নি। সক্রেটিস, প্লেটো ও অ্যারিস্টটল, এই তিনজনের সমন্বিত চিন্তাধারার প্রভাব ছায়ায় গড়ে উঠেছে পশ্চিমা সভ্যতার মূল ভিত্তি। প্লেটোর দর্শনে রাষ্ট্র পরিচালনায় নৈতিকতার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা হওয়ায় তাদের নৈতিকতার আশ্রয়ে ইনসাফের পরিবর্তে ফ্যাসিবাদ গড়ে উঠেছে। ফলে এই দর্শনের ধারক-বাহকরা যে সাম্রাজ্যেই জন্ম নিক না কেন, তাদের আদর্শিক সাদৃশ্য থাকার কারণে বর্ণ-ভাষা, স্থান ও কালের বিভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও তাদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে একটা অদ্ভুত সাদৃশ্য বিদ্যমান আছে।
পশ্চিমা সভ্যতার অন্যতম একটি মৌলিক ভিত্তি হলো Might is Right. অর্থাৎ জোর যার মুল্লুক তার। কিংবা বহুল আলোচিত সেই বিখ্যাত কথাটি Survival of the fittes অর্থাৎ পৃথিবীতে টিকে থাকার অধিকার একমাত্র যোগ্যতম ও শক্তিধরেরই আছে। এখানে দুর্বলের কোনো স্থান নেই। এ মতবাদের ওপর ভিত্তি করেই পশ্চিমা সভ্যতার রাষ্ট্রগুলো সারা বিশ্বের দুর্বল রাষ্ট্র ও জাতিসমূহের ওপর আগ্রাসন চালিয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উপনিবেশবাদ চালু রেখেছে। পৃথিবীর আনাচে-কানাচে কলোনিয়াল স্টেট তৈরি করে কোটি কোটি মানুষের উপর চরম জুলুম ও শোষণ করেছে। শান্তি প্রতিষ্ঠার নাম দিয়ে মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষকে হত্যা করছে। তারা বিশ্বের কোটি কোটি দুর্বলকে বেঁচে থাকার অধিকার পর্যন্ত দিতে রাজি নয়। কারণ তারা তাদের আদর্শ প্রণেতাদের কাছ থেকে নৈতিকতার সংজ্ঞা হিসেবে এটাই শিখেছে যে, শক্তিশালী, ক্ষমতাবান ও কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষাই হলো সবচেয়ে বড়ো নৈতিকতা। তাই সমগ্র বিশ্বব্যাপী তাদের কথিত নৈতিকতার বাস্তব নমুনা প্রতিষ্ঠা করছে। এ লক্ষ্যে তারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ পরিচালনা করেছে। “এই সভ্যতা মাত্র এক শতাব্দীতে আমাদের দুটি ভয়াবহ বিশ্বযুদ্ধ উপহার দিয়েছে।
লন্ডন টাইমস পত্রিকার সমীক্ষা রিপোর্ট অনুযায়ী ভিয়েতনাম যুদ্ধে ৩৬ লাখ ১২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। মানুষ হত্যা করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি উপরন্তু পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ঐ দেশকে বসবাসের অনুপযোগী ও অনাহারে-দুর্ভিক্ষে তিল তিল করে হত্যা করার উদ্দেশ্যে ১ কোটি ৯০ লাখ গ্যালন কেমিক্যাল বিষ বিমান থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়! অন্যদিকে এ আদর্শের ছায়ায় বেড়ে উঠা আরেক সাম্রাজ্যের নাম সোভিয়েত ইউনিয়ন। তাদের তৈরি কমিউনিস্ট সভ্যতার অধীনে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষকে হত্যা করা হয়।
আদতে আধুনিকতা ও তথাকথিত মানবতাবাদের আড়ালে এক নৈতিকতা বিবর্জিত বস্তুবাদী সভ্যতা গড়ে উঠেছে। যা দুর্বলদের জন্য বিপর্যয় ও ধ্বংস নিয়ে এসেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এ সভ্যতার বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠেছে। বছরের পর বছর নিষ্পেষিত হওয়া আফ্রিকার জনগণও তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। সভ্যতার ধ্বজাধারীদের তাদের দেশ থেকে তাড়াতে শুরু করেছে। মুক্তির আশায় নতুন সভ্যতার অনুসন্ধান করছে। শুধু তাই নয়! সভ্যতার উদরে বেড়ে উঠা মানুষগুলোও শান্তির আশায় হাহাকার করছে।
মানুষ শুধু যুক্তিনির্ভর হয়ে বেঁচে থাকতে পারে না। মানুষ যখন নিজেকে প্রশ্ন করে: আমি কে? আমি কোথায় আছি? আমার শেষ ঠিকানা কোথায় হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর যুক্তিনির্ভর না হয়ে স্বভাবতই বিশ্বাস বা ধর্ম সম্পর্কিত হয়ে থাকে। ফলে একসময় মানুষ যেভাবে জাহেলি যুগে অজ্ঞতাবশত বিভিন্ন পাথরের দেবদেবীর পূজা করতো, ঠিক একইভাবে নতুন এক জাহিলিয়াতের আরম্ভ হলো। এই জাহেলিয়াত পূর্বের মতো অজ্ঞতার জাহেলিয়াত নয়; বরং বৈজ্ঞানিক জাহেলিয়াত। মানবসভ্যতার এই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে মানুষ তাদের শূন্যতা বুঝতে পেরেছে। শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন সভ্যতার সন্ধান করছে। যার ফলে পুনরায় বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় পুনর্জাগরণ ও পুনরুত্থান ঘটছে। বিশ্বের সামনে ধর্মের সঠিক শিক্ষা তুলে ধরতে পারলে অচিরেই ইনসাফ ও শান্তিকামী মানুষেরা সত্য ধর্মের সভ্যতার ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ